
প্রথম গোলেই তৈরি হয়ে গেলো এক জয়ের গল্প, এক হামজা চৌধুরীর রাত: নতুন আলোর সূচনা! জাতীয় স্টেডিয়ামের ফ্লাডলাইট নিভে গেছে, গ্যালারির কোলাহল স্তিমিত। কিন্তু তারপরও যেন রাতের আঁধারেও আলোর ঝলকানি! ভুটানের বিপক্ষে এই রাতটা কেবল একটি ২-০ গোলের জয়ের সাক্ষী নয়, এটি বাংলাদেশের ফুটবলে এক নতুন শুরুর ইঙ্গিত। জয় শুধু পয়েন্ট টেবিলেই আসেনি, এসেছে আত্মবিশ্বাসে, ফিরে এসেছে ফুটবলপ্রেমীদের মনে হারানো উন্মাদনাও। ম্যাচের পর সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ কোচ হাভিয়ের কাবরেরা ছিলেন বেশ উৎফুল্ল। তার কোচিং স্টাফদের সাংবাদিকদের আসনে বসিয়ে হাসিমুখে বললেন, “এটা প্রত্যাশিত জয় ছিল। সেট পিস থেকে গোল পেয়েছি আমরা, আর খেলোয়াড়দের মানসিকতা ছিল দারুণ।”
তবে, আসল প্রশংসাটা এল প্রতিপক্ষের শিবির থেকে। ভুটানের জাপানি কোচ আতসুশি নাকামুরা সরাসরি বললেন, “হামজাই পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। সে একজন উঁচুমানের খেলোয়াড়। বল পায়ে এবং বল ছাড়া—দুই ভূমিকাতেই সে অনন্য। মাঠে তার উপস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রা যোগ করে। এ ধরনের খেলোয়াড় যেকোনো দলের জন্যই এক অমূল্য সম্পদ।” তিনি আরও যোগ করেন, “এই ম্যাচটি আমাদের জন্য বেশ কঠিন ছিল। গত বছর থিম্পুতে আমরা বাংলাদেশকে লম্বা বল খেলতে দেখেছি, কিন্তু এই বাংলাদেশ পাসিং, বিল্ডআপ এবং মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণে অনেক উন্নতি করেছে। আর সেই পরিবর্তনের কেন্দ্রেই ছিল হামজা।” কাবরেরাও এই কথায় একমত হয়ে বলেন, “হ্যাঁ, অবশ্যই। ভুটানের কোচের কথা আমি মানছি। হামজার সেট পিস থেকে গোল করা আমাদের পরিকল্পনার অংশ ছিল, এবং তার গোল আমাদের পরিকল্পনাকে সফল করেছে।”
জাতীয় স্টেডিয়ামের দর্শকদের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করলেন কাবরেরা। ভুটানের কোচও মুগ্ধতা প্রকাশ করে বলেন, “আমি সাধারণত উচ্চস্বরে কথা বলি। কিন্তু আজ গ্যালারির আওয়াজে নিজের কথা নিজেই শুনতে পারছিলাম না। এটা স্বাভাবিক, যেহেতু এটা হোম ম্যাচ। তবে দর্শক ছিল অসাধারণ। আমরা হারলেও দারুণ একটি ম্যাচ হয়েছে।”

বাংলাদেশের একাদশে বুধবার দেখা গেছে পাঁচজন প্রবাসী ফুটবলার—হামজা চৌধুরী, জামাল ভূঁইয়া, কাজেম শাহ, ফাহামিদুল ইসলাম এবং তারিক কাজী। এই লাইনআপ কিছুটা চমকপ্রদ ছিল—বিশেষ করে কাজেমের একাদশে জায়গা পাওয়া এবং জামালের প্রত্যাবর্তন। এ নিয়ে কাবরেরার মন্তব্য, “এই লাইনআপে আমি সন্তুষ্ট। সবাই দারুণ আত্মবিশ্বাস নিয়ে খেলেছে।”
অভিষিক্ত ফাহামিদুল ইসলাম তার প্রথম ম্যাচেই আলোচনায় এসেছেন। চোখে পড়ার মতো দৌড়, দু-তিনটি সাহসী শট নিয়েছিলেন, যদিও গোল পাননি। দ্বিতীয়ার্ধে কোচ তাকে তুলে নিলেও, তার খেলা নিয়ে কাবরেরা সন্তুষ্টই ছিলেন। তিনি বলেন, “সে কিছুটা নার্ভাস ছিল। এটা স্বাভাবিক, যেহেতু তার প্রথম ম্যাচ। তবে আমি তার খেলায় খুশি। ম্যাচের সময় পেলে সে আরও ভালো করবে।”
১০ জুন সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের ম্যাচের আগে এই প্রস্তুতি কতটা কার্যকর, এমন প্রশ্নের উত্তরে কাবরেরা সোজাসাপটা বললেন, “খুব ভালো। মাঠের পরিবেশ অসাধারণ লেগেছে আমার কাছে। আমরা সত্যিই এটি উপভোগ করেছি।” উপভোগ করেছেন কানাডাপ্রবাসী শমিত সোমও। ভোরে ঢাকায় পৌঁছে সন্ধ্যায় তিনি বাংলাদেশ-ভুটান ম্যাচ দেখেছেন। ১০ জুন সিঙ্গাপুরের বিপক্ষে তার অভিষেক হওয়ার কথা। সেদিন হয়তো মাঠে হামজা, শমিত, ফাহামিদুলের বাংলাদেশকে দেখতে দর্শকদের ঢল নামবে। এই সবকিছুই প্রমাণ করে, এক জয়ের গল্প, এক হামজা চৌধুরীর রাত: নতুন আলোর সূচনা!
তবে, এই রাতটি পুরোপুরি নিখুঁত ছিল না। ম্যাচ চলাকালে দুজন দর্শক মাঠে ঢুকে পড়েছিলেন, আর ম্যাচ শেষে ঢুকেছিলেন আরও একজন। আবারও সেই পুরোনো শঙ্কা উঁকি দিচ্ছে—কোনো জরিমানা আসছে না তো? ম্যাচ শুরুর আগেই স্টেডিয়ামের বাইরে ফটক ভেঙে গ্যালারিতে ঢুকে পড়েছিলেন দর্শক। ঢাকা স্টেডিয়ামে ফুটবল ফিরেছে ঠিকই, কিন্তু ব্যবস্থাপনার সেই পুরোনো দুর্বল দিকটি রয়েই গেল। তবুও এ কথা বলতেই হয়—এক জয়ের গল্প, এক হামজা চৌধুরীর রাত: নতুন আলোর সূচনা! এই রাতে ফুটবলপ্রেমীরা আবারও তাদের দলকে বুকভরা আশা নিয়ে সমর্থন দিতে পেরেছে। আর সেই আশার কেন্দ্রে ছিল সেই পরিচিত মুখ, হামজা চৌধুরী।
তার দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং দলের সামগ্রিক উন্নতি দর্শকদের মনে নতুন করে স্বপ্ন বুনে দিয়েছে। ভবিষ্যতে আরও এমন জয় দেখার প্রত্যাশা নিয়েই শেষ হয়েছে এই রাত। আর ফুটবল ইতিহাসের পাতায় লেখা হয়ে থাকবে, এক জয়ের গল্প, এক হামজা চৌধুরীর রাত: নতুন আলোর সূচনা!

